Saturday, March 28, 2026

ইরান আর আমেরিকার যুদ্ধে হঠাৎ পাকিস্তান কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?

আরও পড়ুন

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ যখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়াচ্ছে, তখন যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণের ক্ষমতা আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ হয়ে নেই। পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক পদক্ষেপও বেগ পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গত কয়েকদিনে হঠাৎ পাকিস্তানের নাম আন্তর্জাতিক আলোচনায় অনেকবারই উঠে এসেছে।

ইরান আর আমেরিকার এই যুদ্ধে পাকিস্তান হঠাৎ কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এ নিয়ে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন করেছে। সেখানে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা শুধুই তাত্ত্বিক নয়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদে পাকিস্তানের স্পষ্ট পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। গত সপ্তাহে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রকাশনা জানিয়েছে, ইসলামাবাদ নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তান আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক ও নীতিনির্ধারক নেতারা সরাসরি মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে গত রোববার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি ফোনালাপ হয়েছে, যেখানে তাঁরা যুদ্ধের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ট্রাম্পের সঙ্গে আসিম মুনিরের ফোনালাপের পর সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ কথা বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে। সেই ফোনালাপের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলা হয়েছে, দুই পক্ষই ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উত্তেজনা প্রশমন, আলোচনা ও কূটনীতির গুরুত্বের ব্যাপারে একমত হয়েছেন।’

ডন লিখেছে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইসলামাবাদ আলোচনার জন্য সাহায্য করতে এবং উত্তেজনা কমাতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়েছে। কিছু সূত্র বলছে, ইরান ও আমেরিকা যদি রাজি থাকে, কূটনৈতিক পথে হাঁটতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে পাকিস্তান ইসলামাবাদে আলোচনার আয়োজনও করতে পারে।ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বিশিষ্ট গবেষক ভালি নাসর ডন-কে বলেছেন, পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ সৌদি আরবের সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি লিখেছেন, ‘সৌদি আরবের সমর্থন ও প্ররোচনা ছাড়া পাকিস্তান এগোবে না। রিয়াদ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকায় ধরে নেওয়াই যায় যে, পাকিস্তানের দিক থেকে কোনো মধ্যস্থতা কার্যকর হলে তা সম্ভবত সৌদি অনুমোদন পাবে।

আরও পড়ুনঃ  খামেনির মৃত্যুতে ইরানের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন যে তিনজন

পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে আসছে কেন? এই শক্তিটা পাকিস্তান পাচ্ছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সমান্তরাল যোগাযোগ থেকে। বিবদমান দুই পক্ষের সঙ্গেই দৃশ্যমান সম্পর্কের এমন উদাহরণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘মার্কিন-ইরান মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নামটা একেবারে গাছ থেকে পড়ার মতোও নয়। গত বছর পাকিস্তান-ইরানের অনেক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পাকিস্তানকে পছন্দ করে। ট্রাম্প এমনও বলেছেন যে, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানকে যতটা চেনেন, সেভাবে বেশিরভাগ সামরিক নেতাই চেনেন না। যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের কূটনৈতিক স্বার্থও দেখভাল করে পাকিস্তান।’

রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে, উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার সময় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে দেশগুলো, তার মধ্যে তুরস্ক ও মিশরের সঙ্গে পাকিস্তানের নামও থাকবে। এভাবে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে তিন দেশের আগ্রহের কারণ অবশ্য ভিন্ন।

আরও পড়ুনঃ  নতুন সরকারের দ্বিতীয় দিনেই বড় সুখবর!

ওয়াশিংটনে যে মুসলিম কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে ডন-এর, তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, পাকিস্তান ও তুরস্ক দুই দেশেরই ইরানের সঙ্গে সীমান্ত আছে। তাই সংঘাতের যে কোনো প্রভাব তাদের ওপর সরাসরি পড়বে। ইরানে অস্থিতিশীলতা তাই পাকিস্তান বা তুরস্কের জন্য দূরের কোনো সমস্যা নয়, বরং ঘরের পাশের উৎপাত – যা তাদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং শরণার্থী পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা পাকিস্তান আর তুরস্কের দিক থেকে মধ্যস্থতার আগ্রহের কারণ বোঝায়। তারা স্বাভাবিকভাবেই চায়, উত্তেজনা আর না বাড়ুক। সে কারণে কূটনীতির পথ খোলা রাখছে তারা।

মিশরের অবস্থান আলাদা হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তারা সবচেয়ে বড় আরব দেশ, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে তাদের। ফলে কায়রো যেভাবে বার্তা পৌঁছে দিতে পারে, সেটা অন্য অনেক দেশই পারবে না। আরব দেশগুলো ও ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা কায়রোকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি দেয়, বিশেষ করে যেখানে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলো সীমিত।

ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছেন সাম্প্রতিক মিডিয়া রিপোর্টগুলো যে সময়ে হচ্ছে, সেই সময়কেও। প্রথমত, যুদ্ধটা দীর্ঘ হচ্ছে, একটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রাথমিক হামলা ছাড়িয়ে দুই পক্ষে মিসাইল-বিনিময়ের ধরন ও আকার বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ – বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো – যুদ্ধের শুরু থেকেই কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হলেও যত সময় গড়াচ্ছে, ততই এই দেশগুলোর সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে। সেটা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে। একদিকে যখন উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে তাই মিডিয়ার মনোযোগ ঘুরছে সমাধানের পথে। মনোযোগে এই পরিবর্তনই মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসছে।

আরও পড়ুনঃ  ঈদের ছুটি বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করল সরকার

দ্বিতীয়ত, ইরান আর আমেরিকার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সীমিত। ওয়াশিংটনে সরাসরি আলোচনায় বাধা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। অন্যদিকে তেহরানের ক্ষেত্রে মিসাইলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করার ঝুঁকিই আলাদা। এই পরিস্থিতিতে, তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ – বিশেষ করে এমন দেশের যাদের দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ আছে।

তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কার্যক্রম যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, তেহরানের সঙ্গে চলমান সংলাপ, এবং গালফ অঞ্চলের অংশীদারদের সঙ্গে পরামর্শের কথা একসঙ্গে উঠে আসছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। এই কূটনৈতিক তৎপরতা বোঝাচ্ছে, ইসলামাবাদ শুধু পরিস্থিতি দেখছেই না, পরিস্থিতিকে বদলানোর চেষ্টাও করছে।

সংক্ষেপে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা এখন আলোচনায় এসেছে কারণ সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামরিক উত্তেজনার কারণে ব্যয় বেড়েই চলেছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক বিকল্প হাতে আছে সামান্য। সরাসরি যোগাযোগের চ্যানেল যখন সংকুচিত হয়ে আসে, স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধরত দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ থাকা দেশগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ইসলামাবাদের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটছে। ইসলামাবাদ সেটা বুঝতে পারছে এবং সুযোগ ও সময় বুঝে সেই অনুযায়ী অবস্থান নিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুনঃ

সর্বশেষ সংবাদ

জনপ্রিয় সংবাদ