বিশ্বকাপের মৌসুমে প্রিয় দলের খেলা দেখতে মুখিয়ে থাকেন ফুটবলপ্রেমীরা। টিভি বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখা সম্ভব না হলে অনেকে ‘অবৈধভাবে’ থার্ড পার্টির ওয়েবসাইট বা অ্যাপে ফ্রিতে খেলা উপভোগ করেন। তবে প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, ফ্রিতে অনলাইনে খেলা দেখানোর এসব লিংকে প্রবেশ করলেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর ডিভাইস, অনলাইন কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা চুরি করা হয়ে থাকে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ফ্রি অনলাইন ফুটবল স্ট্রিমিং সাইট ব্যবহার করলে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরির ঝুঁকিও থাকে।’
বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেটসহ বড় কোনও ক্রীড়া আসর শুরু হলে অনলাইনে খেলা দেখতে দর্শকদের আগ্রহ বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসংখ্য অননুমোদিত লিংক ছড়িয়ে দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করা হয়।
গত ১১ই জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল। নানা জটিলতার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিসহ মোট তিনটি টেলিভিশন সরাসরি বিশ্বকাপের খেলা দেখানোর সত্ত্ব কেনে। একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে মাই রবি, টফি, বায়স্কোপ ও আইস্ক্রিনে খেলা দেখার সুযোগ রাখা হয়।
যাদের বাসা বাড়িতে টেলিভিশন নেই তাদের অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে খেলা দেখার প্যাকেজ কিনেন। তবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনেই সাবস্ক্রিপশন নেয়া ব্যবহারকারীদের অনেকেই বার বার চেষ্টার পরও ওয়েব সাইটে ঢুকতে পারেননি।
বিশ্বকাপ শুরুর ওইদিন থেকেই ফেসবুক ফ্রি লাইভ দেখার লিংক আছে কি না, কিংবা কোন অ্যাপে ফ্রিতে খেলা দেখা যায় এসব প্রশ্নও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করতে দেখা গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেন, এই ধরনের বড় আসরকে ঘিরে বা ফ্রিতে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা দেখানোর লোভ দেখিয়ে বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার আদলে বিভিন্ন ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা জানান, ওই সাইটগুলো বা থার্ড পাটি অ্যাপসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, সেটা দেখে বোঝার উপায় থাকে না। ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করতে ওয়েব ঠিকানায় সামান্য বানান পরিবর্তন করা হয়।
তিনি যোগ করেন, হুবহু এসব ওয়েবসাইটের মতো দেখে অনেকেই বুঝতে পারেন না। যে কারণে অনেকেই এই সাইটগুলোতে ফ্রি’তে খেলা দেখতে প্রবেশ করে থাকেন।
বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বলেছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভুয়া স্ট্রিমিং সাইট, নকল অ্যাপ, ফিশিং এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উদাহরণ দিয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলছিলেন, ধরেন একজন ফেসবুক পোস্টে ফ্রিতে অনলাইনে খেলা দেখার লিংক খুঁজলেন। তার নিচে কেউ একজন কমেন্টে লিখে দিলেন আজকের খেলার ফ্রি এইচডি লিংক। সেই সাথে একটি লিংক দেওয়া হলো। ওয়েব সাইট বা ফেসবুক লিংক বা অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোরের বাইরের এক ধরনের অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়, এসব লিংকে গিয়ে খেলা দেখার জন্য।
তিনি বলেন, ‘এই ধরনের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে প্রায়ই ম্যালওয়্যার, ট্রোজান, স্পাইওয়্যার এবং ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট লুকিয়ে থাকে, যা ব্যবহারকারীর ডিভাইস আক্রান্ত করতে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরির ঝুঁকিও থাকে।’
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি অনলাইন প্রতারণা সংক্রান্ত অপরাধগুলো নিয়ে কাজ করে দীর্ঘদিন থেকে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘যেসব ফেসবুক আইডির রিচ বেশি সেখানে কমেন্ট করে খেলার লিংক দেয়া হয়। সেটির মাধ্যমে প্রতারক চক্র তাদের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে ব্যবহারকারীদের। সেগুলোতে ক্লিক করে অনেকে প্রতারণার ফাঁদে পড়েন।’
অনলাইনে বিভিন্ন লিংক ছড়িযে প্রতারণার ফাঁদসহ এই ধরনের অপরাধ নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। গত দেড় মাসের অভিযানে ২৭৮টি এমন ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। এর মধ্যে গত ১ মে থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত ২৬৮টি এবং বুধবার ১০টি ওয়েব সাইটের সন্ধান পায়। এই ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করতে তারা বিটিআরসির কাছে চিঠিও দিয়েছে।
এই ঝুঁকির হাত থেকে নিরাপদ থাকতে থার্ড পার্টি অ্যাপ ব্যবহার না করা ও সবসময় অফিসিয়াল ব্রডকাস্টার, অনুমোদিত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যাপ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
