যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্ভাব্য সাবমেরিন যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রশান্ত, ভারতীয় ও আর্কটিক মহাসাগরের বিশাল এলাকায় সমুদ্রতল ম্যাপিং ও নজরদারি কার্যক্রম চালাচ্ছে চীন। নৌ-যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্য ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, চীনের একাধিক গবেষণা জাহাজ দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রাঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ করছে। এর মধ্যে অন্যতম ‘ডং ফাং হং-৩’ নামের একটি গবেষণা জাহাজ, যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাইওয়ান, গুয়াম এবং ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে নিয়মিত চলাচল করেছে।
জাহাজটি চীনের ওশান ইউনিভার্সিটি পরিচালনা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, এটি কাঁদা পরীক্ষা ও জলবায়ু গবেষণায় নিয়োজিত ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, এটি গভীর সমুদ্রের বিস্তারিত ম্যাপিংও করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ম্যাপিং ও সমুদ্রতলে সেন্সর স্থাপনের মাধ্যমে চীন পানির নিচের পরিবেশ সম্পর্কে এমন তথ্য সংগ্রহ করছে, যা সাবমেরিন মোতায়েন, গোপন চলাচল এবং শত্রুপক্ষের সাবমেরিন শনাক্ত করতে সহায়ক।
শুধু একটি জাহাজ নয়, বরং অন্তত ৪২টি গবেষণা জাহাজ এবং শত শত সেন্সর নিয়ে বিস্তৃত এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরের জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রতল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য জাহাজগুলো সাধারণত সমান্তরাল সরু লাইনে সামনে-পেছনে চলাচল করে—যা ম্যাপিংয়ের একটি পরিচিত পদ্ধতি। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও এমন চলাচলের প্রমাণ মিলেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সাবমেরিন বাহিনী প্রধান পিটার স্কট বলেন, “এই ধরনের তথ্য ভবিষ্যৎ নৌযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো সাবমেরিন কমান্ডার তার কার্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইবে।”
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চীনের এই কার্যক্রম ফিলিপাইন, গুয়াম, হাওয়াই এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ওয়েক অ্যাটলের মতো মার্কিন সামরিক স্থাপনার আশপাশে বেশি জোরালো।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জেনিফার পার্কার বলেন, “এই কার্যক্রমের পরিসর দেখলে বোঝা যায়, এটি শুধু সম্পদ অনুসন্ধান নয়—বরং সাবমেরিনভিত্তিক নৌ সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় পরিকল্পনা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ নীতির কারণে বেসামরিক গবেষণা কার্যক্রমও সামরিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ গোয়েন্দা দপ্তরের কর্মকর্তা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাইক ব্রুকস সম্প্রতি এক সাক্ষ্যে বলেন, চীনের এই জরিপ কার্যক্রম সাবমেরিন নেভিগেশন, গোপন চলাচল এবং সমুদ্রতলে অস্ত্র বা সেন্সর স্থাপনে সহায়ক তথ্য সরবরাহ করছে—যা কৌশলগতভাবে উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও সমুদ্র ম্যাপিং কার্যক্রম জোরদার করেছে, তবে তারা সাধারণত সামরিক জাহাজ ব্যবহার করে এবং অনেক সময় ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ রাখে। ফলে চীনের কার্যক্রমের প্রকৃত পরিসর আরও বড় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্র যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্যগত যে সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র ভোগ করছিল, চীনের এই বিস্তৃত উদ্যোগ তা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে পারে।
তাদের মতে, বিশেষ করে ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ অঞ্চলে চীনের ব্যাপক ম্যাপিং কার্যক্রম ইঙ্গিত দিচ্ছে—দেশটি কৌশলগতভাবে ঘেরাও অবস্থা ভাঙতে এবং উন্মুক্ত মহাসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
